চসিক স্বাস্থ্য পরিদর্শকের জালিয়াতি ; ফিটনেস সনদ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ টাকা
সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মেডিকেল সার্টিফিকেট বা ফিটনেস সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী এই সনদ না থাকা দণ্ডনীয় অপরাধ। নগরীতে এ আইন বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক)। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছ থেকে এই সনদ নেওয়ার কথা। তবে চসিকের ইয়াছিনুল হক চৌধুরী নামে এক স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ক্ষেত্রে এ নিয়ম যেন উলটো! নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কৌশলে তিনি এ সনদ সংগ্রহ করছেন জেলা সিভিল সার্জনের কাছ থেকে। এতে প্রতি অর্থবছরে কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চসিক। দীর্ঘদিন ফিটনেস সনদ সরবরাহ করে এমন রমরমা বাণিজ্য করে এলেও ‘রহস্যজনক’ কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ।
Advertisement
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ এবং চাকরির পদ সংক্রান্ত ভুল তথ্য দিয়ে ২০১৬ সালে ‘নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক’ হয়েছিলেন তৎকালীন চসিকের ১৬তম গ্রেডের অস্থায়ী কর্মচারী ইয়াছিনুল। এরপর থেকে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের হোটেল-বেকারিতে গিয়ে মাসোয়ারা আদায় শুরু করেন তিনি। কোথাও কোথাও নিজেকে ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসাবেও দাবি করেন এই কর্মচারী। যেসব প্রতিষ্ঠান মাসোয়ারা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে যাদের সঙ্গে ইয়াছিনুলের মাসিক ‘সখ্য’ রয়েছে, তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ নিয়ে চসিকের অন্য স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে ইয়াছিনুলসহ ১০ জন পরিদর্শক রয়েছেন। তারা নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বেকারিতে কর্মরতদের ফিটনেস সনদের আওতায় আনতে তদারকি করেন। এর মধ্যে ৯ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক চারটি ওয়ার্ড করে এবং ইয়াছিনুল পাঁচটি ওয়ার্ডের দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু ‘নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক’ হওয়ায় প্রত্যেক ওয়ার্ডেই সমান তালে বিচরণ করেন ইয়াছিনুল। এই সুযোগে সিভিল সার্জন থেকে ফিটনেস সনদ দিয়ে প্রতিমাসে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি। নগরীর অভিজাত ২০টি খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে। সেখানে কর্মরত অন্তত দেড় হাজার কর্মচারীকে ফিটনেস সনদ দিয়েছেন ইয়াছিনুল। এগুলোর কোনোটি দেওয়া হয়েছে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বাক্ষরে, আবার কোনোটি সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরে। এসব সনদের জন্য জনপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, যা নির্ধারিত ফির চেয়ে ৮-১০ গুণ বেশি। তবে এসব সনদের বিপরীতে চসিকের রাজস্ব খাতে কোনো টাকাই জমা হয়নি। সনদে সেসব স্মারক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোরও অস্তিত্ব নেই চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে। যার পুরো টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে স্বপ্ন সুপার শপের ১১০, ওয়েল ফুডের ১০০, বনফুল অ্যান্ড কোং-এর ২০০, কে-বেকারির ১১০, ড্রিপস বেকারির ১০, মেরিডিয়ান স্ন্যাকসের ১০০, সৌদি বাংলা রেস্টুরেন্টের ৩০, হোটেল আগ্রাবাদের ৫০, পিটস্টপ বেকারির ৮০, ফ্লেভারস সুইটসের ৬০, ডিলাইট হোটেলের ২০, হান্ডিতে ৫০, সাদিয়াস কিচেনের ৮০ এবং পশ্চিম মাদারবাড়ীর তিনটি বেকারির ১৫০ জন।
এ বিষয়ে স্বপ্ন সুপার শপের লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টের এজিএম মো. শাওন বলেন, ‘গত বছর আমাদের জামালখান, খুলশী, পাহাড়তলীসহ বেশকিছু আউটলেটের কর্মচারীর ফিটনেস সার্টিফিকেট করানো হয়েছিল। সেগুলো চসিকের স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াছিনুল হক চৌধুরী সিভিল সার্জন থেকে করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিটি সার্টিফিকেটে কত টাকা নিয়েছেন, এই তথ্য দেওয়া আমার জন্য বিব্রতকর।’ জানতে চাইলে চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানা বলেন, ‘নগরীতে সিভিল সার্জনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। এ ধরনের কোনো সনদ দিয়ে থাকলে বিভাগীয় পরিচালককে (স্বাস্থ্য) জানানো হবে। তাছাড়া আমি যেসব সনদ দিই, সেগুলো রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়। এমন কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীন আলম বলেন, ‘নগরীর কোনো ফিটনেস সনদে আমার স্বাক্ষর থাকার কথা না। হয়তো আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।’


