শিরোনাম

South east bank ad

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের ক্রান্তিকালে জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল

 প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৮:১১ পূর্বাহ্ন   |   সেনাবাহিনী

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের ক্রান্তিকালে জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল

 কর্নেল ইব্রাহিম ফারুক, বিজিবিএম
 
লোগোজন্মলগ্ন থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেশপ্রেমের সুর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের অন্তরে ধ্বনিত হচ্ছে। ‌‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ ... এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি জাতির বিভিন্ন সংকট ও ক্রান্তিকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন এবং দেশ গঠনেও রেখে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ সমগ্র বিশ্বে দক্ষ, অভিজ্ঞ, সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও আদর্শ একটি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে দেশের সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে, যা শুধু সশস্ত্র বাহিনীর নয়, বরং এদেশের সকলের জন্য গর্বের বিষয়।


বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি রক্ষার দায়িত্ব যেমন সেনাবাহিনীর ওপর বর্তায়, তেমনি জাতির দুর্দিনে বেসামরিক প্রশাসন তথা জনগণের জানমালের চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিধানের দায়ও সাংবিধানিকভাবে সেনাবাহিনীর। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখা সেনাবাহিনীর মুখ্য কাজ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা। দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধান সমুন্নত রাখার আদর্শিক প্রেরণায় সেনাবাহিনীর ওপর অর্পিত সকল দায়িত্ব নিরলসভাবে পালন করে নিজস্ব কর্মকাণ্ডের বাইরে সমাজ ও জাতি গঠনের কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারকে সহযোগিতা করছে সেনাবাহিনী।


সেনাবাহিনীর এই দায়িত্ব গ্রহণ কেবল নিরাপত্তা রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের মৌলিক কার্যক্রম সচল রাখা, জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতার ভিত্তি পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জুলাই আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। বহু থানায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা সংঘটিত হয়, যার ফলে অনেক এলাকায় থানা কার্যত পুলিশশূন্য হয়ে পড়ে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুত, দৃঢ় ও সুসমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।


৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের ৫৪টি জেলায় ২৯০টির অধিক অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে এবং রাজধানী ঢাকার ২৯টি থানাসহ সারাদেশে মোট ৪১৭টি থানার কার্যক্রম পুনরায় সচল করতে কার্যকর সহায়তা প্রদান করে। সেনাবাহিনীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে ধীরে ধীরে পুলিশ বাহিনী পুনরায় তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় এবং নাগরিক জীবনে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। এসময়ে সেনাবাহিনীকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়, যার মধ্যে সহিংসতা, লুটপাট, ডাকাতি এবং বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ উল্লেখযোগ্য। সারাদেশে সংঘটিত ১৯৪৩টি ডাকাতি, ৬৫৫টি রাজনৈতিক সহিংসতা, ৩৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ এবং আরও ৩৫০৮টি জনবিক্ষোভের ঘটনা চিহ্নিত করে সেনাবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার অংশ হিসেবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এসব অভিযানের মাধ্যমে বহু কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয় এবং তাদের অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়, যা সমাজে অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশব্যাপী একটি বিস্তৃত ও সুসমন্বিত মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা এবং অপরাধ প্রবণতা হ্রাসের লক্ষ্যে পরিচালিত এই অভিযানে সেনাবাহিনী অত্যন্ত পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এই চলমান অভিযানের আওতায় এ পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ ৩৮ হাজার ১৩৫ পিস ইয়াবা, ২৩,৯২৭ বোতল ফেনসিডিল এবং ৯.০৪২ কেজি গাঁজা। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ১,০১৩ জন সক্রিয় মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা দেশের মাদকবিরোধী কার্যক্রমে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকা গুলশান, মহাখালী ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পরিচালিত একাধিক অভিযানে মাদক, দেশীয় অস্ত্র এবং অপরাধী চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে এই অভিযানে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, যা স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। এ লক্ষ্যে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৯৪৪টি লুট হওয়া বা অবৈধ অস্ত্র এবং ২,৮৭,৭৯৪ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। 

জুলাই আন্দোলনের অল্প সময়ের মধ্যেই ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও সিলেটে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমন সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে মানবিক সহায়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট তাৎক্ষণিকভাবে দুর্গত এলাকায় মোতায়েন হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিরলসভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং মোট ৫৭,৮৩৯ জন সাধারণ নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে বন্যা কবলিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সেনাবাহিনী ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর আওতায় ৭,১৬,৬৫৪ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩,৪০,৫০১ বোতল বিশুদ্ধ পানি বিতরণ এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয়। এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে প্রায় চার লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে চিকিৎসা সেবা লাভ করে, যা দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জুলাই ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বেসামরিক আহতদের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনে আহত প্রায় পাঁচ হাজার নাগরিককে দেশের বিভিন্ন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) অদ্যাবধি চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে প্রায় এক হাজার জনের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব সুষ্ঠু, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা দায়িত্বশীল ও পেশাদারিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিক যেন নির্বিঘ্নে তাদের নিজ নিজ উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেন এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী দেশব্যাপী সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকে। ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বিশ্ব ইজতেমা, শারদীয় দুর্গাপূজা, বড়দিন ও বৌদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে সেনাবাহিনী কর্তৃক গৃহীত সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত টহল জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন এবং অনান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসাধারণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করা হয়।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দেশের শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা রোধে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৬০০ এর অধিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী। কারখানাগুলোকে চালু রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে বর্তমানে দেশের ২০৯৭টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে একটি বাদে সব কারখানা এখন চালু রয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে (মূলত গাজীপুর, আশুলিয়া, ও সাভার এলাকায়) ৬৯৪টি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং এধরনের পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত ঘটনায় ১৯০ বার মূল সড়ক অবরোধ নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে এবং কারখানাগুলোকে চালু রাখার জন্য মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ৭০০ এর বেশি বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে সেনাবাহিনী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও বহু মানুষের জানমালের ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সেনা টহলের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

পরিচালনাগত নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি সারাদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সংস্কার, সড়ক মেরামত এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। দক্ষ পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর ফলে জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচল সহজতর হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার গতি বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক নাগরিক সেবা উন্নত হয়। এই বহুমাত্রিক উদ্যোগসমূহ সংকট-উত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কার্যকর অবদান রাখার পাশাপাশি দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জুলাই আন্দোলনের পূর্বাপর সময়ে দেশের পার্বত্যাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকের অজানা। এ সময় বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের হাত থেকে স্থানীয় নিরীহ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় সেনাবাহিনীর কেবল বিশেষ যৌথ অভিযান নয়, জীবনবাজি রেখে কাজ করে অসংখ্য কেএনএফ সদস্য ও তাদের সহায়তাকারীদের গ্রেফতার করেছে। স্বয়ংক্রিয়সহ নানান ধরনের বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। এসব করতে গিয়ে সেনাবাহিনী কয়েকজন সদস্য নিহতও হয়েছেন। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগামে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়াতে এবং কক্সবাজার জেলায় এফডিএমএন ক্যাম্প এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রশংসিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১,০৩,০০০ (এক লাখ তিন হাজার) সেনাসদস্য দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায়, ৪১১ উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোয় মোট ৫৪৪ অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেছে। নির্বাচনকালীন সময়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত, নিয়মিত টহলের মাধ্যমে জনমনে সাহস জোগানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহ নজরদারিতে রাখা, নির্বাচনী সরঞ্জাম নিরাপদে পরিবহন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা প্রদান করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং জাতির স্বার্থে সদা বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ/স্থাপনা নিরাপত্তা প্রদান এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিদ্যমান আইন মেনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশজুড়ে কাজ করে যাচ্ছে। যেকোন অপচেষ্টা নস্যাৎ করে জাতি গঠন এবং উন্নয়নমূলক কাজে আরো সম্পৃক্ত হওয়ার দৃঢ় শপথে অঙ্গীকারাবদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সদা জাগ্রত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশের ক্রান্তিলগ্নে সেনাবাহিনী অসাধারণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের সঙ্গেই একাত্ম ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনী দেশের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। দেশপ্রেমের আদর্শ ও দেশ গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা করা সেনাবাহিনী তরুণ প্রজন্মের কাছে আজ আলোর দিশারীস্বরূপ। সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও আমাদের সেনাবাহিনী আর্তমানবতার সেবা করে চলেছে। একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশসেবায় সেনাবাহিনীর অগ্রণী ভূমিকা দেশপ্রেমিক গণমানুষের কাছে পাথেয় হয়ে আছে এবং থাকবে ।
BBS cable ad

সেনাবাহিনী এর আরও খবর: