ট্রাইব্যুনালে গুমের লোমহর্ষক বর্ণনা, শিগগিরই শেষ হচ্ছে বিচার
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের তিনটি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে শতাধিক গুমের অভিযোগে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে প্রসিকিউশন।
এ তিন মামলার চলমান সাক্ষ্যগ্রহণে উঠে আসছে গুমের লোমহর্ষক নানা বর্ণনা। ইতোমধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিরা।
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হলো—আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি, আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দিই, র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার আগে ও পরে আমার সাক্ষাৎকারে আসবেন।
‘যারা র্যাবে যেতেন, তাদের আমি বলতাম, নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ।
সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত-পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া।’
তিনি বলেন, ‘যারা ফেরত আসতেন, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে র্যাবে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনেছি, র্যাব যাদের হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।’
‘র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব কমান্ডিং অফিসারকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি।’
ইমরুল কায়েসের জবানবন্দি
সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েস তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘জিয়াউল আহসান স্যারের সঙ্গে এক বছর তিন-চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসেবে থাকার সময় আমি লক্ষ্য করি, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিদের গুম করতেন। তিনি র্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এসব পন্থার মধ্যে ছিল গুলি ও ইনজেকশন।’
‘পূর্বে বর্ণিত ঘটনার বাইরে আরও ১০-১২ জন ব্যক্তিকে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইনজেকশন প্রয়োগের কাজ কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে সংঘটিত হতো।’
জবানবন্দির একপর্যায়ে এই সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি র্যাব থেকে চলে যাওয়ার পর আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারিনি। আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি; তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়।’
‘আমি রানার হিসেবে তার সঙ্গে থেকে দেখেছি, তিনি ওই সময়ে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে যেন কখনো আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’
ডা. আশিক উল আকবরের জবানবন্দি
গুমের শিকার ডা. আশিক উল আকবর তাকে তুলে নেওয়ার দিনের বর্ণনায় বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৩ মে আমার মামার বাড়ি টঙ্গী, গাজীপুরে থাকা অবস্থায় রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে দরজার বাইরে প্রচণ্ড নক করার শব্দ পাই। দরজা খোলার পর ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারীকে দেখতে পাই। তারা আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার মাথায় একটি পাতলা কালো কাপড় পরিয়ে মারধর করতে করতে আমাকে বাসা থেকে বের করে আনে। এ সময় আমি একটি কালো মাইক্রোবাস দেখতে পাই।’
‘তারা আমাকে মাইক্রোবাসে বসিয়ে চোখ শক্তভাবে বেঁধে জমটুপি পরিয়ে দেয়। আমার দুই পাশে দুজন বসে আমার কোমর শক্ত করে ধরে এবং পেছন থেকে আমাকে ধারাবাহিকভাবে মারতে থাকে।’
পরে কাপড় দিয়ে ঘেরা একটি জায়গায় রাখা হয় উল্লেখ করে ডা. আশিক বলেন, ‘সেখানে আমার দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হয়। আমার পরনের কাপড়চোপড় খুলে পুরোনো একটি লুঙ্গি পরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার খাওয়ার সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দেওয়া হতো। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।’


