শিরোনাম

South east bank ad

তাহসিফের মৃত্যুতে বাড়ছে প্রশ্ন, তদন্তে সামনে আসছে নতুন তথ্য

 প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ন   |   বিচার বিভাগ

তাহসিফের মৃত্যুতে বাড়ছে প্রশ্ন, তদন্তে সামনে আসছে নতুন তথ্য
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। রাজধানীর উত্তরা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং পরদিন তুরাগ নদে মরদেহ পাওয়া-পুরো ঘটনাপ্রবাহের অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
এরই মধ্যে তার সঙ্গে সর্বশেষ সময় কাটানো বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং পরিচিত তরুণী জেরিকা তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের যোগাযোগের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ বলছে, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, পরিবারের দাবি, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে।

যেভাবে শুরু রহস্যের

ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ ও ২৮ অক্টোবর। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ।
পরিবারের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে দেখা করতে তিনি বাসার নিচে নেমেছিলেন।

২৮ অক্টোবর বিকেল পৌনে ৬টার দিকে নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয় তাহসিফ হিসেবে। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তার এমন মৃত্যু পরিবার ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

শেষ রাতের গতিবিধি: সিসিটিভিতে যা পাওয়া গেছে

তদন্তে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ। ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দীপের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও দিশাকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্তোরাঁ ও বারে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছান দীপ। তিনজন প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের বের হতে দেখা যায়। তবে ওই এলাকায় যাওয়ার কারণ কী ছিল, সেখানে তাদের সঙ্গে আর কারও দেখা হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। আবার আর একটি সূত্র বলছে বার থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। তাদের দাবি সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তারা মাজার রোড দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলকে একসঙ্গে বস্তিতে ঢুকতে দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে ছিলেন তাহসিফ।
তবে তাহসিফ সেখানে গিয়ে কোনো মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলেও সূত্রটি জানিয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি অ্যালকোহল বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

টঙ্গীতে মোটরসাইকেল উদ্ধার, দীপের বক্তব্যে প্রশ্ন

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর তার মোটরসাইকেলটিরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানায়, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তদন্তকারীরা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপের বক্তব্য ছিল, তারা টঙ্গীর ওই এলাকায় অবস্থানকালে কয়েকজনের ধাওয়ার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি সেখান থেকে সরে যান।

পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় , ‘আমরা এখনও তার (দিপ) বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছি না। দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। তারা কেন ওই মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপ একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি সেখানে যাননি বলেও দাবি করেন। ওই এলাকা আগে থেকে তার পরিচিত ছিল না বলেও জানান দিপ।

ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল: কী জানা গেছে

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর টঙ্গী নৌ পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তার চোখ ও মুখ বন্ধ ছিল এবং পেট কিছুটা ফোলা ছিল বলেও সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরে মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয় ময়নাতদন্তের জন্য।

পরিবার কেন হত্যা মামলা করল

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম শুরু থেকেই ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চেয়েছেন। তিনি পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, তার ছেলে সাঁতারে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তাই শুধু নদে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্য দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না বলে তার মনে হয়েছে।

৩১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাবার করা লিখিত আবেদনে সরাসরি কাউকে হত্যার অভিযোগ করা হয়নি। বরং ছেলের মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

পরে উত্তরখান থানা আবেদনটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করে। মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়। এরপর ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে থাকা দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

রিমান্ডে দীপ ও দিশা, তদন্তের নতুন পর্যায়

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ৩০ অক্টোবর দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে হত্যা মামলা হওয়ার পর তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৩১ অক্টোবর ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

১ নভেম্বর একই মামলায় জেরিকা তাসনিম দিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে তার একাধিক স্থানে যাতায়াত এবং যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। সেদিন আদালত তারও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তকারীরা দীপ ও দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখতে চান। ঘটনার আগে ও পরে তাদের অবস্থান, যোগাযোগ এবং চলাচলের তথ্য যাচাই করে মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন, পর্যবেক্ষণ করছে রাওয়া

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে শুধু পরিবার নয়, মানবাধিকার সংগঠনও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

মানবাধিকার সহায়তা সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
BBS cable ad

বিচার বিভাগ এর আরও খবর: