South east bank ad

পুলিশের লুট হওয়া সহস্রাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি

 প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন   |   অন্যান্য

পুলিশের লুট হওয়া সহস্রাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি

 

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলায় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি।
লুট হওয়া মোট অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩২৮টির এখনো হদিস মেলেনি, সন্ধান মেলেনি গোলাবারুদেরও বড় একটি অংশের। 

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, মোট লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ২৩ শতাংশ এবং গোলাবারুদের প্রায় ৩৯ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে এসএমজি, সাবমেশিনগানসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। একই সঙ্গে সে সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যেও ৭১৩ জন এখনো ফেরারি, যাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত। 

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে ব্যাপক জনরোষের শিকার হয় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা। পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩২৮টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩৩টি এসএমটির মতো সাবমেশিনগান। এছাড়া রয়েছে এসএমজি ২২২টি, চায়না রাইফেল ১ হাজার ২টি, এসএমজি-টি ৩১টিসহ বিভিন্ন মডেলের অত্যাধুনিক অস্ত্র। এছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন থানা থেকে লুট হয়ে যায় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৪টি। বাকি ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৪টি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার হয়নি। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বোরের গুলি ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৩১টি, টিয়ার গ্যাস সেল ১১ হাজার ৩৮১, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড ২৯১, সাউন্ড গ্রেনেড ১ হাজার ১৬৮, কালার স্মোক গ্রেনেড ৪১, মাল্টিপল ব্যাংক স্টান গ্রেনেড ২২, ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড ২৮৪ ও হ্যান্ড হেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে (ক্যানিস্টার) ১১৬টি।

এছাড়া ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের কারাগারগুলো থেকে ২ হাজার ২৩২ বন্দি পালিয়ে যান। যার মধ্যে দুর্ধর্ষ অপরাধীও রয়েছেন। কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬, শেরপুর থেকে ৫০০, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ ও কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ বন্দি পালিয়ে যান।

এর বাইরে জামালপুর কারাগারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখান থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। সব মিলিয়ে দেশের কারাগার থেকে সে সময় ২ হাজার ২৩২ বন্দি পালিয়ে যান। পরে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফেরত আনা সম্ভব হলেও এখনো ফেরারি ৭১৩ জন।

সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের ১৭টি কারাগার বিশৃঙ্খলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় পালিয়ে যাওয়া বন্দি ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। এসব বন্দির অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।


অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রগুলো যেমন একদিকে নানা অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে, ঠিক তেমনই পলাতক বন্দিরাও নানা ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে চলছেন। যেসব বন্দি কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, হত্যা, অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে দুর্ধর্ষরা আবার নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে পারেন, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তারা বিভিন্ন মামলার আসামি ছিলেন। জেল ভেঙে পালিয়ে তারা আরো বেশি অপরাধ করার সুযোগ পেয়েছেন। দেশে চলমান খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোর পেছনে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করতে হবে। তা না হলে এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। পাশাপাশি সে সময় কারাগার থেকে যেসব বন্দি পালিয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিলেন। তারা সাধারণ অপরাধী না। এসব অপরাধী কারো হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াতে পারেন। কারণ তারা টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে কাজ করেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যেসব অপরাধের দায়ে কারাগারে ছিলেন, তার বাকি সাজা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তারা এই যে দীর্ঘ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে থাকলেন, এ সময়ের হিসাবটাও তাদের কাছ থেকে নেয়া এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’

থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে বড় একটি অংশ এরই মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি, সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার সম্ভব হবে।’

সৌজন্যে : বণিক বার্তা
BBS cable ad