এফডিআরের ৬২ কোটি টাকা সিইওর কবজায়!
রক্ষকই যেন ভক্ষক! অনেকটা ‘বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার’ মতো অবস্থা! যেখানে ‘কাস্টোডিয়ান’ হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে তিনি নিজেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ঘুমে রেখে’ এক-দুই লাখ নয়; একেবারে ৬২ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিজের জিম্মায় রেখেছেন। তা-ও আবার রয়েসয়ে নয়; এক দিনে, একযোগে। সরকারি সব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, সবার অগোচরে নীতিবহির্ভূতভাবে এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও মো. নজরুল ইসলাম। এখন তিনি নতুন করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে তা আবারও জমা করবেন বলে জানিয়েছেন।
যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এফডিআর ভাঙার যেমন কোনো সুযোগ সুযোগ নেই, তেমনি নতুন অ্যাকাউন্ট খোলারও বিধান নেই। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এমন জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। অবশ্য এই কাজে প্রশাসকের সায় আছে বলে সিইও দাবি করলেও প্রশাসক তা অস্বীকার করেন।
উপসচিব মো. নজরুল ইসলাম গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা পরিষদের সিইও হিসেবে যোগ দেন।
এর আগে তিনি কুমিল্লায় পাঁচ মাস এবং শরীয়তপুরে চার মাস দায়িত্ব পালন করেন। ওইসব কর্মস্থলেও নানা কারণে বিতর্কিত নজরুল ইসলাম গাজীপুরে এসে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে বিভিন্ন মহলে চাউর হয়। তারই ধারাবাহিকতায় গাজীপুর জেলা পরিষদের ৬২ কোটি টাকার এফডিআর ভেঙে পে অর্ডার বানিয়ে তাঁর নিজের কাছে রেখে দেওয়ার মতো অভিনব জালিয়াতির খবর পায় কালের কণ্ঠ। পরে এটি নিয়ে অনুসন্ধানে গিয়ে সিইও নজরুল ইসলামের তুঘলকি এমন কাণ্ড ধরা পড়ে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গাজীপুর জেলা পরিষদের নামে ৬২ কোটি টাকারও বেশি অঙ্কের এফডিআর আগে থেকেই বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে রয়েছে। এসব এফডিআরের আয়ের একটি অংশ নিয়মিতভাবে জেলা পরিষদের কর্মীদের বেতন বা নিত্য খরচের কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব মেয়াদি এফডিআর পরিণত সময়ের আগে আকস্মিকভাবে ভেঙে ফেললে এর মুনাফা পাওয়া যায় না। অথচ জেলা পরিষদের সিইও নজরুল ইসলাম স্থানীয় সরকার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাউকে না জানিয়ে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে একযোগে একই দিনে ১৪টি ব্যাংকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কে করা এফডিআর ভেঙে ফেলেন।
অনুসন্ধান বলছে, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল তিনি একযোগে যে ১৪টি ব্যাংককে এফডিআর ভাঙতে চিঠি দেন এর মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা, জনতা ব্যাংক গাজীপুর শাখা, আইএফআইসি ব্যাংক বোর্ডবাজার শাখা, এনআরবি ব্যাংক মাওনা শাখা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা, রূপালী ব্যাংক জয়দেবপুর শাখা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আওড়াখালী শাখা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক জয়দেবপুর শাখা ও প্রিমিয়ার ব্যাংক জয়দেবপুর চৌরাস্তা শাখা অন্যতম।
চিঠিতে সিইও নজরুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর স্থানীয় মহাব্যবস্থাপক কিংবা ব্যবস্থাপকদের উদ্দেশ করে লেখেন, ‘আপনার ব্যাংকে গাজীপুর জেলা পরিষদের নামে করা এফডিআর...হিসাব নম্বরের পুঞ্জীভূত অর্থ সুদসহ গাজীপুর জেলা পরিষদে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ওই হিসাবের পুরো অর্থ জেলা পরিষদের অনুকূলে পে অর্ডারের মাধ্যমে প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’ এফডিআর থাকা ১৪টি ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নামে দেওয়া চিঠিতে প্রায় একই কথা উল্লেখ করা হয়। চিঠি পাওয়ার পর ওইসব ব্যাংকও তা অনুমোদন করে এবং গাজীপুর জেলা পরিষদের অনুকূলে তা পাঠিয়ে দেয়। ওইসব চিঠির বেশ কয়েকটি কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকদের কাছে এসেছে। ব্যাংকগুলো অবশ্য অনুমোদিত চিঠির অনুলিপি স্থানীয় সরকার ঢাকা বিভাগের পরিচালক, ঢাকার প্রশাসক, গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষক বরাবরও পাঠিয়ে দেয়। এর পরই বিষয়টি অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়। সিইওর এমন জালিয়াতি যখন পরিষদের ভেতরে ‘কানাঘুষা’ হচ্ছিল, তখন সিইও এফডিআরের টাকা অন্য কোনো ব্যাংকে নতুন করে অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে জমা করবেন বলে জানান।
কালের কণ্ঠ অনুসন্ধান করে জেনেছে, কোনো সিইও একক ক্ষমতায় জেলা পরিষদের কোনো এফডিআর ভাঙতে পারেন না। কোন জেলা পরিষদের এফডিআর ব্যবস্থাপনা কিভাবে হবে, তার একটি নির্দেশনা স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জারি করে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ অধিশাখা থেকে জারি করা ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়, ‘জেলা পরিষদের এফডিআরকৃত অর্থে গাড়ি ক্রয় বা অন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে না। কোনো বিশেষ প্রয়োজনে এফডিআর ভাঙানোর প্রয়োজন হলে সে ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে। শুধু তা-ই নয়; ওই নির্দেশনার আরেক স্থানে বলা হয়, জেলা পরিষদের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তন বা নতুন কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে না এবং জেলা পরিষদের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে জেলা পরিষদের কোনো অর্থ জমা বা লেনদেন করা যাবে না। এ ধরনের কোনো লেনদেন হলে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন।
অথচ স্থানীয় সরকারের ওই নির্দেশনা পুরো উপেক্ষা করেছেন সিইও নজরুল ইসলাম। বরং এক দিনে একযোগে তিনি ১৪টি ব্যাংক থেকে ৬২ কোটি টাকার এফডিআর ভাঙিয়ে পে অর্ডার করে নিজের জিম্মায় রেখেছেন। এখন বলছেন, তা নতুন করে অ্যাকাউন্ট খুলে জমা করবেন। অথচ নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা বা নতুন করে এফডিআর ভেঙে লেনদেন করা আইনত অবৈধ।
এমন অভিনব জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলাম এ ধরনের কাজ করা যে অনিয়ম হয়েছে, সেটি স্বীকার করেন। তবে তিনি যুক্তি দেখান যে, অনেকগুলো ব্যাংক বর্তমানে ‘গ্রিন জোনের’ বাইরে চলে গেছে এবং সেগুলোতে সুদের হার কম বা অনেক পুরনো। তাই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এবং লভ্যাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি এই অর্থ আধুনিক ব্যাংক ও গ্রিন জোন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছেন। সিইও আরো বলেন, পরিষদের প্রশাসকের জ্ঞাতসারেই এটি হয়েছে এবং টাকা অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেকের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়েছে।
এদিকে বিষয়টিতে তাঁর সম্মতি রয়েছে কি না তা জানতে গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার ড. চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকীর দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অভিযোগগুলো আমি জানলাম। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যেহেতু ঘটনাগুলো আমি দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বের, সে ক্ষেত্রে সব ঘটনার দায়ভার তাঁকেই নিতে হবে।’
সরকারি তহবিলের টাকায় খোলা এফডিআর এভাবে একক সিদ্ধান্তে কোনো সিইও ভাঙতে পারেন কি না তা জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) ড. মো. মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য মন্ত্রণালয় সমর্থন করে। কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকে আর্থিক স্বচ্ছতা মানতে চায় না। তাই মন্ত্রণালয় আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। পরিপত্র কিংবা দাপ্তরিক কাগজেই নিয়ম-নীতি উল্লেখ করা আছে। এটি কেউ অমান্য করলে ব্যবস্থার বিধান আছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না থাকলে কোনোভাবেই এফডিআর ভাঙতে পারবে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিবেচনায় কিংবা শর্ত সাপেক্ষে এটি হতে পারে।’
কিন্তু গাজীপুর জেলা পরিষদের সিইও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এ রকম কোনো বিশেষ বিবেচনার ধার ধারেননি। এমনকি ঊধ্বর্তন এমন কাউকে অবহিতও করেননি। আর এখন তা চাউর হয়ে যাওয়ার পর নতুন কোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে রাখবেন, সেটিরও কোনো অনুমোদন নেই। সিইওর এমন নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে সরকারি তহবিলের বিপুল অঙ্কের টাকা এখন পে অর্ডার আকারে একা সিইওর জিম্মায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটিও অবৈধ। এভাবে তিনি টাকা নিজের কাছে রাখতে পারেন না। এতে একদিকে যেমন গাজীপুর জেলা পরিষদ বিপুল অঙ্কের টাকার মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি এতগুলো পে অর্ডার হারিয়ে যাওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে।


